টাইগ্রিস তীরের বলিউড: সাদ্দাম হোসেনের চলচ্চিত্র সাম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন


13

একটা সময় ছিল, যখন বাগদাদের আকাশে শুধু যুদ্ধের দামামা বাজত না, শোনা যেত ক্যামেরার ক্ল্যাপবোর্ডের আওয়াজ। ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন চেয়েছিলেন—তার দেশ শুধু তেল বা যুদ্ধের জন্যই পরিচিত হবে না, বরং বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। এমন স্বপ্ন নিয়েই তিনি শুরু করেছিলেন এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প—ইরাককে পরিণত করতে চেয়েছিলেন টাইগ্রিস নদীর তীরে বলিউডের মতো এক চলচ্চিত্র নগরীতে।

এক মহাপরিকল্পনার শুরু

১৯৮০ সাল। ইরাক-ইরান যুদ্ধের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত। সাদ্দাম হোসেন ঘোষণা দিলেন, বড় বাজেটের আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে ইরাকে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শুরু হয় ‘Clash of Loyalties’ নামে এক চলচ্চিত্রের কাজ। কাহিনির পটভূমি ছিল ১৯২০ সালের ইরাক, যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সেখানে গণবিপ্লব হয়।

এই প্রকল্পের অন্যতম মুখ্য ব্যক্তি ছিলেন ব্রিটিশ-ইরাকি চলচ্চিত্র পরিচালক লতিফ জোরেফানি। ১৯৫০-এর দশক থেকে চলচ্চিত্রে যুক্ত এই মানুষটির কাছে প্রস্তাব এলো—ইরাক সরকার বড় বাজেটের ছবি নির্মাণে আগ্রহী, তিনি কি এতে যুক্ত হতে চান? লতিফ উত্তরে না বলেননি। তিনি অনুভব করেছিলেন, ইতিহাসের এক অধ্যায়ের অংশ হতে যাচ্ছেন।

স্বপ্নে সাদ্দাম, উদ্যোগে বন্ধুরা

অনেকের প্রশ্ন ছিল—এ কি সাদ্দাম হোসেনের অহমিকা পূরণের আরেক প্রয়াস? লতিফ জোরেফানি তা মানেন না। বরং তিনি বলেছিলেন, “আমাদের বন্ধুরাই সাদ্দামের কাছে গিয়েছিল। তারা বলেছিল, ‘স্যার, আমরা যদি আন্তর্জাতিক সিনেমা ব্যবসায় ঢুকতে চাই, বিনিয়োগ করতে হবে।’ সাদ্দাম সায় দিয়েছিলেন—‘শুরু করো, যা লাগে, আমি দিচ্ছি।’”

এমন একটি বড় বাজেটের ছবির জন্য বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ তারকাদের আনা হয় বাগদাদে। অভিনেতা অলিভার রীড, হেলেন রায়ান এবং জেমস বোলাম ছিলেন ছবির মুখ্য চরিত্রে। পাশাপাশি সুযোগ পান ইরাকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ফাতিমা আল-রুবাই। তিনি অভিনয় করেন দারি আল মাহমুদের স্ত্রীর চরিত্রে—ইরাকের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কিংবদন্তি নেতা।

শুটিংয়ে ইতিহাস আর রোমাঞ্চ

ছবির শুটিং শুরু হয় ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি। ইরাকী অভিনেতা ফাতিমা আল-রুবাই স্মরণ করেন, “প্রথম দিনের শুটিংয়ে আমরা আনন্দে আত্মহারা। মনে হচ্ছিল, ইতিহাসের এক অংশ আমরা নিজের হাতে গড়ে তুলছি।”

একবার এক দৃশ্যে তাকে ঘোড়ায় চড়তে হয়েছিল। প্রশিক্ষণের পর শুটিং চলাকালে হঠাৎ ঘোড়াটি তাকে নিয়ে ছুটে যায়। “আমি ভয় পাইনি। বরং মনে হয়েছিল, এ এক দারুণ অভিজ্ঞতা,” বলেন ফাতিমা।

যুদ্ধের ছায়া, থেমে থাকা ক্যামেরা

কিন্তু ঠিক তখনই, ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয় ইরাক-ইরান যুদ্ধ। লতিফ লন্ডনে বসেই খবর পেলেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে—রকেট, বিস্ফোরণ আর মৃত্যু। উদ্বিগ্ন পরিবারের অনুরোধে চলচ্চিত্রের কাজ বন্ধ রাখতে হয় সাময়িকভাবে। ইরাক সরকার যদিও শান্তির ইঙ্গিত দিয়েছিল, বলেছিল “সীমান্তে কিছু গোলমাল” চলছে মাত্র।

কয়েক সপ্তাহ পর আবার নির্দেশ এলো—শুটিং শুরু করতে হবে। কিন্তু তখন লতিফ জোরেফানির সামনে একাধিক সমস্যা। শুটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার পোশাক ও অস্ত্রসজ্জা, ইউরোপ থেকে ইরাকে আনা ছিল কঠিন। তুরস্ক যুদ্ধকালীন নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ায় তার ভূখণ্ড দিয়ে এই সরঞ্জাম বহন নিষিদ্ধ করল। বাধ্য হয়ে ঘুরপথে—গ্রিস, লেবানন, সিরিয়া হয়ে মরুভূমি পার করে বাগদাদে আনতে হয় সবকিছু।

বাস্তব ও কাল্পনিক যুদ্ধের দ্বন্দ্ব

একদিন ইরান সীমান্তের কাছে একটি দৃশ্য শুট করা হয়—এক ব্রিটিশ ট্রেনের ওপর হামলার দৃশ্য। পরদিন ইরানী মিডিয়ায় ঘোষণা আসে, “আমাদের বিপ্লবী বাহিনী ইরাকে প্রবেশ করে একটি সামরিক ট্রেন ধ্বংস করেছে।” যুদ্ধের বাস্তবতা আর সিনেমার জগত—এই দুই মিলে তৈরি হলো বিভ্রান্তি।

মদ, উচ্ছৃঙ্খলতা এবং পেশাদারিত্ব

অন্যদিকে, বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় অভিনেতা অলিভার রীড। অতিরিক্ত মদ্যপান, হোটেলে পার্টি, রেস্টুরেন্টে কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ—লতিফের জন্য রীতিমতো মাথাব্যথা। এমনকি ইরাকের মন্ত্রীরা তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে বলেন। লতিফ তখন বলেন, “আল্লাহর দোহাই, একটু সহ্য করুন। ছবির অর্ধেক কাজ শেষ, এই অবস্থায় কীভাবে তাকে বাদ দিই?”

অবাক করার বিষয়, এই উচ্ছৃঙ্খল রীডই প্রতিদিন সকাল ছ’টায় ঠিকঠাক সেটে হাজির হতেন, কাজ করতেন নিষ্ঠার সঙ্গে। ফাতিমা আল-রুবাই তাকে দেখেছেন, মদের ক্যান দিয়ে পিরামিড বানিয়ে অভিনয়ে যেতেন—অদ্ভুত অথচ পেশাদার।

যুদ্ধের ডামাডোলে প্রস্থান

যুদ্ধ তীব্রতর হতে থাকায় ছবির শুটিং দ্রুত শেষ করতে হয়। সব অভিনেতাকে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হয়। লতিফ জোরেফানি ছবির সম্পাদনার কাজ শেষ করেন লন্ডনে। ১৯৮৪ সালে লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এটি দেখানো হয়। তবে ছবিটি কখনোই পশ্চিমা দেশগুলোর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি।

স্বপ্নের মৃত্যু, অতীতের আক্ষেপ

ইরাকে আর কোনো ছবি করার সুযোগ পাননি লতিফ। যুদ্ধ, ধ্বংস আর গোষ্ঠীগত সংঘাতের কারণে সে স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। তিনি বলেন, “আমরা ছবি বানিয়েছিলাম, স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু আজকের ইরাকে তাকালে—তিন দশকের যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিভক্তি দেখে মন ভেঙে যায়।”

এখনো তিনি ইংল্যান্ডের দক্ষিণে থাকেন। তার গ্যারাজে সংরক্ষিত আছে ‘Clash of Loyalties’-এর আদিম ফুটেজ। আর ফাতিমা আল-রুবাই? এখনো বাগদাদে, এখনো অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। তাদের সেই স্বপ্ন—টাইগ্রিস তীরের বলিউড—আজ শুধুই ইতিহাসের এক অপূর্ণ অধ্যায়।


বিবিসি বাংলা’র একটি লেখা অনুসরনে