আবার বেড়েছে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম

এক মাসের ব্যবধানে আবার বেড়েছে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম। মাঝে এক মাস ৫দিন স্থিতিশীল থাকলেও বুধবার (২৭ এপ্রিল) তা আবার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অস্বাভাবিক আমদানি ব্যয় বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে শক্তিশালী হচ্ছে ডলার; বিপরীতে দুর্বল হচ্ছে টাকা।

গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে এক ডলারের জন্য ৮৬ টাকা ২০ পয়সা খরচ করতে হয়েছিল; সেখানে আজ বুধবার লেগেছে ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা। আর ব্যাংকগুলো ডলার বিক্রি করছে এর চেয়েও পাঁচ-ছয় টাকা বেশি দরে। ফলে খোলা বাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ৯১-৯৩ টাকায়।

করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় স্থির ছিল ডলারের দর। ৫ আগস্ট থেকে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। বাড়তে বাড়তে ৮৬ টাকায় উঠার পর ১০ জানুয়ারি থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত ওই দামে স্থিতিশীল ছিল। এর প্রায় আড়াই মাস পর ২২ মার্চ ডলারের দাম বেড়ে ৮৬ টাকা ২০ পয়সা হয়েছে। এর প্রায় এক মাস পর আবার বেড়েছে ডলারের দাম। এই হিসাবে গত সাত মাসে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকা ১ টাকা ৬৫ পয়সা দর হারিয়েছে।

ডলারের বিপরীতে টাকার মানের অবমূল্যায়নে কিছুটা স্বস্তিতে থাকেন দেশের রফতানিকারকরা। তাদের মতে, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান ডলারের বিপরীতে তাদের মুদ্রার মান কমিয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে তারা মুদ্রার মান অবমূল্যায়ন করেই চলছে, কিন্তু সেই তুলনায় বাংলাদেশ এখনও সেভাবে অবমূল্যায়ন করেনি। রফতানিকে উৎসাহিত করতে টাকার মান আরও অবমূল্যায়ন করা উচিত বলে তারা মন্তব্য করেন তারা।

তবে, ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন আমদানিকারকরা। একদিকে করোনায় সামুদ্রিক জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং কন্টোইনার সংকটে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। কাঁচামাল ও উৎপাদনে মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে বর্ধিত দামে। এর সঙ্গে ডলারের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধি যোগ হচ্ছে পণ্যের উৎপাদন খরচে। ফলে ভোক্তাসাধারণকে আগের চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। আর সেই মূল্যস্ফীতির চাপে নাকাল হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।

আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে চাল, ডাল, ভোজ্য ও জ্বালানি তেল, শিশুখাদ্য, মসলা, গম, বিমানের টিকিট ও বিদেশে চিকিৎসা খরচ। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) জাতীয় বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে পাঁচ শতাংশের ঘরে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও ফেব্রুয়ারি শেষে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ছয় দশমিক ১৭ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বাড়ায় বাজারে ডলারের সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, আমদানির লাগাম টেনে ধরা ছাড়া ডলারের বাজার স্বাভাবিক হবে না। তারা বলেন, মুদ্রা বিনিময় হারে যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে মুদ্রার আরো অবমূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তারা বলেন, এই সময়ে বিদেশি আয় ধরতে টাকার মান আরও কমাতে হবে। এতে প্রবাসী আয় ও রফতানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

এদিকে, রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেও দামে লাগাম টানতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রাবাজার স্বাভাবিক রাখতে ডলার বিক্রি করেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর অর্থসূচককে বলেন, ডলারের মূল্য বেড়ে ব্যাংকে এখন ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা। আর খোলাবাজারে তা প্রায় ৯৩ টাকা। এক্ষেত্রে পার্থক্য অনেক বেশি। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় অর্থের স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘিœত হতে পারে।

এই অবস্থায় মুদ্রার আরো অবমূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাজারকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ তুলে নিতে হবে। বাজারকে বাজারের মতো চলতে দিতে হবে। এভাবে ১০-২০ পয়সা করে না বাড়িয়ে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে যদি ইন্টারব্যাংক রেট (আন্তব্যাংক রেট) ৮৭ টাকা ৮৮ টাকাও হয়, তাও যেতে দিতে হবে। তাহলে ব্যাংকগুলো ও কার্ব মার্কেটের সঙ্গে ব্যাংক রেটে ডলারের যে পার্থক্য তা কমে আসবে। ধীরে ধীরে বাজার স্থিতিশীল-স্বাভাবিক হয়ে আসবে। আমি মনে করি, সেটাই হবে একটা স্থায়ী সমাধান।
পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের প্রণোদনা তুলে দেওয়া উচিত। এতে রফতানি আয় বাড়ার পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক খুব ধীরে ধীরে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এটা আরও সময়োপযোগী হলে দেশের জন্য ভালো হতো।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; ৫০ শতাংশের মতো। কিন্তু রেমিট্যান্স না বেড়ে উল্টো ২০ শতাংশ কমেছে। রফতানি আয় বাড়লেও তা চাহিদার চেয়ে অনেক কম।

এই অবস্থায়, আমদানি ব্যয় কমানোর কোন বিকল্প নেই। এটা না করতে পারলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে। কয়েক মাস আগেও রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এখন ৪৪ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

 

আহসান মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী। জিনিসপত্রের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে। অবশ্য বিশ্বজুড়েই এখন মূল্যস্ফীতি বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও চালের দাম চড়া। এর প্রভাব বাংলাদেশেও কিছুদিন থাকবে। অন্যদিকে আমদানি অনেক বাড়ছে। সেই তুলনায় রফতানি আয় এবং রেমিট্যান্স বাড়ছে না। ফলে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।

ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে চাল আমদানি বাড়াতে হবে। গত বছরও ৮ লাখ টন চাল আমদানি করেছিল সরকার। চলতি বছর তা বাড়িয়ে ১৫-২০ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে।

প্রবাসী আয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রণোদনা দিয়ে প্রবাসী আয় বাড়ানো যাবে না। কারণ খোলা বাজারে ডলার বিক্রি করলে প্রতি ডলারে ৫-৬ টাকা বেশি পাওয়া যায়। এটা ১ টাকায় নামিয়ে আনতে হবে।

প্রসঙ্গত, গত জানুয়ারি থেকে প্রবাসী আয়ের ওপর আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। আগে যা ছিল ২ শতাংশ।

এদিকে, ব্যাংকগুলোর চাহিদা মেটাতে প্রচুর ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবমিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বুধবার পর্যন্ত প্রায় দশ মাসে (২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত) ৪৬০ কোটি (৪.৬০ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও বাজারের অস্থিরতা কাটছে না। বেড়েই চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলারের দর।

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছে যে দরে ডলার বিক্রি বা কেনে তাকে আন্তব্যাংক লেনদেন ব্যাংক রেট বলে। ব্যাংকগুলোও একে অন্যের কাছ থেকে এই রেটে ডলার কেনাবেচা করে থাকে। চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলো এই দরের চেয়ে সাড়ে চার-পাঁচ টাকা বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ব্যবধান কখনই এক থেকে-দেড় টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, ডলারের বাজার পুরো অস্থির হয়ে পড়েছে। সরবরাহ নেই, চাহিদা তুঙ্গে। এটা সহসাই কমার কোন লক্ষণও নেই। এর প্রভাব পড়বে রিজার্ভে ও দেশের অর্থনীতিতে। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদে টাকার সমস্যায় পড়বে। তবে এখনো পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে টাকার চেয়ে ডলারের সংকট বেশি।

যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজারে ডলারের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় অস্বাভাবিক দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। রিজার্ভে পর্যাপ্ত ডলার জমা আছে। প্রয়োজনমতো সেখান থেকে ডলার বাজারে ছাড়া হবে।

এর আগে, গত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাজার থেকে রেকর্ড প্রায় ৮ বিলিয়ন (৮০০ কোটি) ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও ২০ কোটি ৫০ লাখ ডলার কেনা হয়। এরপর থেকেই ডলারের চাহিদা বাড়তে থাকে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজনীয় ডলার বাজারে সরবরাহ করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ডলারের মূল্য ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা হলেও ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ৯২ টাকায় ডলার কেনাবেচা করছে। সেই দামে আমদানি বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন (৪ হাজার কোটি) ডলারে নেমে এসেছে। রোববার দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার।

গত বছরের ২৪ আগস্ট এই রিজার্ভ অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৫৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি।

রেমিট্যান্সের ৯ মাসের তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ১ হাজার ৫২৯ কোটি ৮৫ লাখ (১৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৮ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে এই ৯ মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ১৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

তবে রফতানি বাণিজ্যে বেশ উল্লম্ফন ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এই ৯ মাসে বিভিন্ন পণ্য রফতানি করে ৩৮ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৩ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।

অর্থসূচক/ মৃত্তিকা সাহা

 

The post আবার বেড়েছে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম appeared first on Arthosuchak.

মূল প্রতিবেদনটি এখানে পেতে পারেন।