ইমন রেজা’র পাঠকাহন: কবি এবং বড়ো কবি ও ছোট কবি-পর্ব ১

হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ একসময় বড়ো কবি ছিলেন। কবিতায় না হলেও আড়ম্বরে। নিন্দুকেরা বলে থাকেন, বড়ো বড়ো কবিরা তাকে কবিতা লিখে দিতেন, সেগুলো তার নামে ছাপা হতো। সত্য নাকি রটনা জানিনা, জানতে ইচ্ছেও করেনা। তবে, মজার বিষয় হচ্ছে, কবি এরশাদের কিছু কবিতা আমার ভালো লেখেছিলো, যখন পড়েছিলাম। সে অনেক আগে। এখন ভালো লাগবে কীনা জানিনা, এখন পড়তে আর ইচ্ছে করেনা। আবার কখনো ইচ্ছে হলে পড়বো।

তসলিমা নাসরিনের প্রবন্ধের পাঠক নিঃসন্দেহে বেশি। তারপরে তার উপন্যাসের পাঠকও কম নয়। কিন্তু তসলিমার গুরুত্ব আমার কাছে বেশি তার কবিতার জন্য। প্রবন্ধ তার পরে। অনেকে হয়তো বলবেন, আপনি কবিতা বোঝেনইনা।

আমি কবিতা বুঝি কি বুঝিনা সেটির থেকে আমার কাছে বড়ো হলো কবিতাটি আমার ভালো লেগেছে কীনা। ভালো না লাগলে, যতো ভালো মহৎ উন্নত শিল্পোত্তীর্ণ কবিতাই হোকনা কেনো, আমি সেটিকে বাতিল করি। কেননা, আমি আনন্দের জন্য পড়ি।

সুতরাং, বড়ো কবি ছোট কবি, এগুলো আমার কাছে অবান্তর, অনেকটা।

ধরা যাক, আজকে সরদার ফারুক এর একটি কবিতা পড়ে আমার খুবই ভালো লাগলো। প্রথমবার পড়লাম, ভালো লাগলো। দ্বিতীয়বার পড়লাম, আরো ভালো লাগলো। তৃতীয়বার পড়লাম, ভালোলাগাটুকু থেকেই গেলো। সুতরাং সরদার ফারুক বড়ো কবি, আমার কাছে।

এখন, আজকে যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কয়েকজন বড়ো কবির নাম বলেন। আমি বলবো সরদার ফারুক, তিনি, তিনি…। আপনি কি আমাকে বলবেন, যে, রবীন্দ্রনাথ না বলে আমি সরদার ফারুক বলেছি কেনো? বলছি, কারন, আজকে আমি সরদার ফারুক পড়েছি এবং পড়ে আনন্দ পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথ তিন সপ্তাহ আগে পড়েছিলাম, পড়ে আনন্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু আজকে সেই আনন্দের কথা ভুলে গেছি। এখন আমার পাঠের আনন্দে সরদার ফারুক।

মানে দাঁড়াচ্ছে, যার যে কবিতা পড়ে আমার ভালো লাগে, তার সে কবিতার জন্য আমি তাকে বড়ো কবি মানি। আবার সেই বড়ো কবির কোনো কবিতা পরেরদিন পড়ে যখন ভালো লাগেনা, তখন পরেরদিন তাকে আর বড়ো কবি মনে করিনা।

এজন্য, আপনি আমাকে চরিত্রহীন ভাবতে পারেন, সে আপনার ইচ্ছে। কেননা, পাঠের ক্ষেত্রে, আমি ভিন্ন ভিন্ন নারীর দরোজায় কড়া নাড়া লম্পটের মতো অনেকটা, এক জায়গায় স্থির নেই। সুতরাং, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন স্বর ও সুরের লহরী, ভিন্ন ভিন্ন বোধ, ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ।

ফলে, আমি কবির নাম ধরে কবিতা পড়িনা। কবিতা পড়ার পর কবির নাম খুঁজি। সেকারনে, আমি আল মাহমুদের খোঁজ করিনা, বরং সোনালি কাবিন খুঁজি। আল মাহমুদের কথা যখন চলেই আসলো, তখন আরেকটু বলি। আমার বিবেচনায়, সোনালি কাবিন লেখার পরে, আল মাহমুদ চুপ মেরে গেলেও তেমন কোনো ক্ষতি হতোনা। ‘যে পারো ভুলিয়ে দাও’ তার না লিখলেও চলতো। সোনালি কাবিন কতোবার পড়েছি তার কোনো হিসেব নেই। প্রতিবার ভালো লেগেছে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ ভালো লেগেছে। এগুলো যখন পড়ি, আমি নিঃসন্দেহে নিঃসংকোচে বলি, আল মাহমুদ বাংলাদেশের প্রধান কবি। কিন্তু যে পারো ভুলিয়ে দাও পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আল মাহমুদ দূর্বল সাহিত্যিক।

কোনো কবিতা পড়ে যখন ভালো লাগেনা, আমি তখনো কবির নামটি দেখি। তারপরে, আরেকদিন সেই কবির কবিতা যখন আবার পড়ি, ভালো লাগেনা, তখনও তাকে আমি বাতিল করিনা। পরপর কয়েকটি কবিতা পড়ে যখন কোনো ভালোলাগাই খোঁজে পাইনা, তখন তাকে আমি ছোটকবি ভাবতে শুরু করি। এমন হয়েছে যে, মারুফ রায়হানকে আমি ম্যালাদিন পর্যন্ত ছোটকবিই ভেবেছি। কেননা, তার অনেকগুলো কবিতা পড়েও ভালো লাগেনি। বরং মারুফ রায়হান সম্পাদিত ‘বাংলামাটি‘তে কাজল শাহনাওয়াজকে পড়ে ভালো লেগেছিলো একদিন। সেদিন ভেবেছিলাম, দূর! সম্পাদক কী লেখেন এইগুলা, তিনি বরং সম্পাদক হিসেবেই ভালো, কেননা ভালো কবিতা ছাপেন! কিন্তু, একদিন মারুফ রায়হান ধরা দিলেন আমাকে। ভালো লেগে গেলো। বহুবার ভালো লেগেছে পরেও।

মাসুদ খান বরাবরই বড়ো কবি, আমার কাছে। তার কবিতা আমার ভালো লাগে, আমাকে ভাবায়, মোহাবিষ্ট করে। কিন্তু কখনো কখনো তাকে মনে হয় ছোটকবি। কী লিখলেন এটা, কয়েকবার পড়েও ভালো লাগলোনা! ফলে, আবার তাকে পড়বার ইচ্ছেটা থেকে যায়। আবার পড়ি, হয়তো ভালো লাগে, হয়তো মোটেই ভালো লাগেনা। যখন ভালো লাগে, তখন তিনি তো বড়ো কবি বটেই, এমনকি জরুরি কবি। কিন্তু যখন ভালো লাগেনা, অকপটে বলি, তখন তিনি ছোটকবিই।

না, যা সন্দেহ করছেন মোটেই তা নয়। আমি বিনয়ী। আমি নরম, কোমলপ্রাণ, কাউকে ছোট করে দেখতে পারিনা। কিন্তু আমার পাঠ, আমার কাছে। আপনার মূল্যায়নকে বিবেচনায় নিয়ে আমি পড়তে চাইনা। আমি বরং পাঠপূর্বক মূল্যায়নের পথিক। আমি আগে পড়ি, তারপর মূল্যায়ন করি। আমার পাঠের জায়গায়, সুতরাং আমি বিনয়ী নই।

ফলে, শামসুর রাহমান আমার কাছে কখনো বড়ো কবি, কখনো ছোটকবি। সেইভাবে, এমনকি আমি নিজেও কখনো কখনো আমার কাছে বড়ো কবি হয়ে উঠি।
(ক্রমশ..)

সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০। মিরপুর, ঢাকা।