ইসলামে সম্পদের বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের নিয়ম-নীতিঃ সংক্ষিপ্ত আলোচনা- ২য় পর্ব


68

দ্বিতীয় কিস্তি

ধারাবাহিকের প্রথম কিস্তিটি আগেই প্রকাশিত হয়েছিলো। এবার ধারাবাহিক প্রবন্ধের দ্বিতীয় কিস্তি দেয়া হলো। যারা প্রথম কিস্তি পড়তে আগ্রহী তাঁরা এখানে দেখতে পারেন।

ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রধান প্রধান দিক নির্দেশনা:

ইসলামে সম্পদের বন্টন ও ভোগ-ব্যবহারের নিয়ম-নীতিকে সঠিকরুপে মেনে চলতে তথা ইসলামী অর্থনীতি ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে যে যে নির্দেশনাগুলোকে প্রথমেই আত্মস্থ করতে হবে সেগুলোকে একটু দেখে নিলে ভাল হয়।

প্রথমতঃ আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-প্রসূত বিধি প্রয়োগের যোগ্যতার ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গই নিযুক্ত হবেন দায়িত্ব পালনের জন্য। কেননা, ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকেই মানুষের ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে আল-কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শকে ভিত্তি করে। এ আদর্শ মানুষকে মুমীন হিসেবে সুসমন্বিতভাবে সংগঠিত ও বিবর্তিত ব্যক্তিবর্গে রূপান্তরিত করে। ইসলামী জীবনের অধীনে ব্যক্তি মানুষ আদর্শবাদের নৈতিকতা এ বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পূর্ণ মানুষ, আংশিক সংকীর্ণ মানুষ নয়। এ সকল পূর্ণ মানুষই সংগঠিত করে সুসমন্বিত সমাজ সত্তা এ সামাজিক আচরন। সামাজিক ইসলামী নৈতিকতা ও বিধি থেকেই আসে প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হয় শিক্ষা-প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হয় মানুষের রাষ্ট্ররূপ ও সরকার। প্রতিষ্ঠিত সরকার প্রতিনিধিত্ব করে ব্যক্তি চরিত্রের গুণমর্যাদার। পারস্পরিক আলোচনা ও পরামর্শ নীতি অনুসরনে তাঁরা  প্রতিনিধিত্ব করবেন সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের সংকল্পকে- যার নির্দেশ আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত। সে সংকল্প প্রশিক্ষণ ও পূর্ণ জ্ঞান থেকেই উদ্বুদ্ধ হবে। (সূত্র: ভূমিকা, আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০)। ক্ষমতা ভোগ বা ক্ষমতা প্রদর্শন নয়, দায়িত্ব পালনের জন্য, আর শাসক ও শাসিত উভয়কেই কর্তৃত্ব ও দায়িত্বের ক্ষমতা লাভ করতে হবে আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে। কেননা আল্লাহ ঘোষনা করছেন: “হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহর বিধি পালন করো, রাসুল (স.) কে অনুসরন করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বের দায়িত্বে আসীন তাদের আদেশ পালন করো। তোমরা যদি কোনো কিছু নিয়ে মতবিরোধে পৌঁছো, তাহলে তাকে আল্লাহ ও রাসুলের কাছে বিচারের জন্য পেশ করো।” (সূরা আন-নিসাঃ ৫৯)।

দ্বিতীয়তঃ ইসলামী অর্থব্যবস্থায় মানুষের ভূমিকা পূর্ণ মানুষ হিসেবে। মানুষ শুধু শ্রম নয়। শ্রমের পরিমান বা শ্রমশক্তিই মূল্য বা মর্যাদার উৎস নয়। মানুষের ভূমিকা কেন্দ্রীয় শক্তি- যে শক্তি মানুষকেও গড়ে, সমাজকেও গড়ে, আবার অর্থনীতিকেও গড়ে। মনোবল, বুদ্ধিবল, জ্ঞানবল, উদ্যোগবল এবং শ্রমবল মিলিয়ে মানুষ এসব গড়ে। আর তার ফলেই গড়া হয়ে যায় সভ্যতা আর অগ্রগতির ইতিহাস আর তারই উপযোগী হয় মানুষের কাজকর্ম ও আচরন। তারই মধ্যে প্রতিফলিত ও প্রবাহিত হয় প্রক্রিয়া ও প্রগতির স্রোতধারা। মানুষ এ স্রোতধারার নির্মাণকর্তা আবার নির্মিত প্রতিনিধি, বিশ্বস্রষ্টার প্রতিনিধি। আর বিশ্বস্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করতে হয় বিশ্বস্রষ্টার বিধানের প্রয়োগের সাহায্যে আর প্রকৃতির শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানব সম্পদকে বিশ্বস্রষ্টার আমানত বলে গণ্য করে। (সূত্র: প্রাগুক্ত)। আর তাই ইসলামী অর্থব্যবস্থার ৩টি মৌলনীতি।

১. শ্রম, প্রয়াস আর উদ্যোগ ছাড়া কিছু গড়া হয়না আর গড়া না হলে মানুষের পাওয়ার বা অর্জন করার কিছু নেই।

২. পৃথিবীর সব সম্পদ মানুষ সন্ধান করবে, আহরন করবে ও অর্জন করবে শুধু তাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। তার সাথে পার্থিব জীবনের প্রয়োজনকে ভুলে না যাওয়ার জন্য। সে উদ্দেশ্যেই বিশ্বস্রষ্টা মানুষকে কর্তৃত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আর পৃথিবীতে দিয়েছেন জীবনকে সফল করার সব পাথেয়।

৩. অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের মালিকানা ইসলামী সংজ্ঞায় হবে আমানতদারী, যা তত্ত্বাবধানের সংকীর্ণ মালিকানা- নিরংকুশ মালিকানা নয়। আল্লাহ প্রদত্ত সকল সম্পদ ও শক্তিকে  আল্লাহ মানুষের ব্যবস্থাধীন করেছেন, যাতে মানুষ স্রষ্টার দান থেকেই পার্থিব সম্পদ নির্মাণ, উৎপাদন ও বিতরণ করতে পারে এবং অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে। আর সংগে সংগে যেন নিজেকে প্রকৃত সম্পদোপকরনের স্রষ্টার আমানতদার মনে করে।

তৃতীয়তঃ ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় পণ্য ও সেবার উৎপাদন হবে ইসলামী ভোগ প্রক্রিয়ার অনুসারী এবং উৎপাদনের প্রক্রিয়া হবে সামাজিক কল্যাণমুখী ও শোষণমুক্ত। ‘হালালান তাইয়্যেবান’ অর্থাৎ ইসলামী সংজ্ঞায় হালাল ও পবিত্র ভোগ্য পণ্য ও সেবা সরবরাহ করাই উৎপাদন পদ্ধতি ও সংগঠনের কাজ। উৎপাদনের প্রক্রিয়ার ভিত্তি হলো-

১. ভোগব্যবস্থা শরীয়া বিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এবং অপচয় ও বিলাসের সমর্থন অবাঞ্চিত, ফলে অর্জিত আয়ের ব্যয় ও বন্টন হবে উৎপাদনমুখী।

২. অর্জিত উদ্বৃত্ত আয় ব্যয় করা হবে অর্থনৈতিক উৎপাদনে পুঁজি ব্যবহারের মাধ্যমে এবং সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে (যাকাত ও সদকা বন্টনের মাধ্যমে)।

৩. বৃহদাকার উদ্যোগে জমাকৃত সঞ্চয়ের তহবিলকে পুঁজি হিসেবে গ্রহন করে সে তহবিল সূদহীন ব্যাংক ব্যবস্থায় সূদহীন ঋণ বা পুঁজি শেয়ার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। সূদ ভিত্তিক লেনদেন ইসলামী উৎপাদন ব্যবস্থাতে হারাম বা অবৈধ। ফলে, সামাজিক শোষনের একটি বিরাট হাতিয়ারকে বর্জন করা হয়েছে। জাতীয় আয়ের এ অংশ সূদবর্জিত উৎপাদন প্রক্রিয়াতে আয় বৃদ্ধি করবে সব শ্রেণীর মানুষের, যা বর্ধিত শ্রম মজুরী হিসেবে এবং দায়িত্ব বন্টন ব্যবস্থায় বর্ধিত মুনাফার অংশ বন্টন মাধ্যমে, যার ফলে আবার সঞ্চয় প্রক্রিয়া এবং উদ্যোগ ও উৎপাদন প্রক্রিয়া শক্তিশালী হতে থাকবে। (সূত্র: প্রাগুক্ত)

চতুর্থত: ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় ভোগের প্রক্রিয়া ও জীবন যাপনের মান ‘শরীয়া’র বিধির অধীন। ভোগের মাত্রা ও ভোগের পণ্য ‘শরীয়া’র বিধি অনুসারে নিয়ন্ত্রিত হয়। “হে মানবমন্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তুসামগ্রী ভক্ষন করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরন করোনা, সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল-বাকারাঃ ১৬৮)।” “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার করো, যেগুলো আমি তোমাদেরকে রুযী হিসাবে দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় করো আল্লাহর, যদি তোমরা তাঁরই বন্দেগী করো।” (সূরা আল-বাকারাঃ ১৭২)। (সূত্র: হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী (র.), অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, তাফসীরে মা’আরেফুল-কুরআন, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪০০ হিঃ, পৃষ্ঠা- ৪৬০)। এখানে পণ্য ভোগের যোগ্য হবে যদি তা ‘হালালান তাইয়্যেবান’ অর্থাৎ ইসলামী সংজ্ঞায় হালাল ও পবিত্র হয়। সূতরাং যা হালাল নয় ও পবিত্র নয় তা চাহিদা ও ভোগের অন্তভূর্ক্ত নয়। ভোগ এক্ষেত্রে শুধু জৈব প্রক্রিয়া নয়। এ হলো ইসলামী জীবনবাদী প্রক্রিয়া, যার অধীনে মানুষ এক নির্ধারিত পরিমিত ভোগ করে এবং সে সুযোগের জন্য মৌল অর্থনৈতিক সম্পদের স্রষ্টা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। নিয়ন্ত্রিত ভোগই এভাবে ভিত্তি স্থাপন করে নিয়ন্ত্রিত উৎপাদনের ও বিতরণের। (সূত্র: ভূমিকা, আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০)।

 

সহায়িকা:

  • তাফসীরে মা’আরেফুল-কুরআন, হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী (র.), অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪০০ হিঃ।
  • আল-কুরআনে অর্থনীতি, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৯০।
  • ইসলামী স্যোসাল ফ্রেমওয়ার্ক (Islamic Social Framework), অধ্যাপক রায়হান শরীফ, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮০।
  • http://ipcblogger.net/bashar/?p=281
  • http://thisislamis-notislamatall.blogspot.com/2011/12/blog-post_4490.html
  • আল-কুরআনুল করীম, প্রথম খন্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৭৯।

(চলবে…)