উইলিয়াম ‘ফ্যাটি’ ফৌলকে: ফুটবল ইতিহাসের এক অপ্রতিরোধ্য গর্জন


27

কথায় বলে, কেউ কেউ জন্মগতভাবেই আলাদা হয়ে জন্মায়। কেউ শারীরিক গঠন আর শক্তিতে অতুলনীয় হয়, কেউবা তার ভঙ্গিমা আর খেলার ঢঙ্গ দিয়ে দর্শক ও প্রতিপক্ষকে মুগ্ধ করে। ইংল্যান্ডের প্রাচীন ফুটবল মাঠের এমনই এক কিংবদন্তি ছিলেন উইলিয়াম ‘ফ্যাটি’ ফৌলকে—যিনি ছিলেন ফুটবলের এক বিশালাকার দানব, যার নাম শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই নয়, সমগ্র ফুটবল ইতিহাসেও স্মরণীয় হয়ে আছে।

ফুটবল মানেই যে কেবল দ্রুত দৌড়ানো, চমৎকার পাস দেয়া বা গোল করা, তা নয়। গোলরক্ষকরা কখনো কখনো আকাশচুম্বী উচ্চতা আর চটপটে গতির চেয়ে বড়ো শরীর আর অনন্য আক্রমণাত্মক ক্ষমতার জন্য ইতিহাসে নিজেকে স্বতন্ত্র করে রাখে। ফৌলকের সেই এক অন্যরকম গল্প। তিনি ১৮৯৪ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় পনেরো বছর ফুটবলকে দিয়েছিলেন নিজের প্রাণ। শেফিল্ড ইউনাইটেড, চেলসি আর ব্র্যাডফোর্ডের মতো ক্লাবে খেলেছেন, কিন্তু তার গায়ে, ফুটবল মাঠের ময়দানে ভর করে ছিল তার শারীরিক আকৃতি আর মানসিক দৃঢ়তা।

একটু চিন্তা করুন, একটা সময় ছিল যখন একজন সাধারণ ব্রিটিশ পুরুষের গড় উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। আর ফৌলকের উচ্চতা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলে—কেউ বলেন ৬ ফুট ২, কেউ ৬ ফুট ৪, আবার কেউ ৬ ফুট ৯ পর্যন্ত উচ্চতা উল্লেখ করেন। কিন্তু ওজন নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তার ওজন ছিল প্রায় দেড়শ কেজি! ভাবুন, দুই জন স্বাভাবিক আকৃতির লোক তার শর্টসের দুই পাশে ঢুকে যেতে পারতো সহজেই। সেই দেহটিই ফুটবল মাঠে ছুটে বেড়াতো, তার আরেক নাম ছিল ‘ফ্যাটি’—দর্শকদের দেওয়া স্নেহমিশ্রিত ডাক।

ফৌলকের ফুটবল যাত্রা শুরু হয় ব্ল্যাকওয়েল মাইনার্স ওয়েলফেয়ার এফসির মতো ছোট্ট দলের সঙ্গে, যেখান থেকে তাকে স্কাউট করে নিয়ে যায় শেফিল্ড ইউনাইটেড—তখনকার ফুটবল জগতের একটি শক্তিশালী ক্লাব। শেফিল্ডে তার অবস্থান গড়ে ওঠে মজবুত ও দীর্ঘকালীন। ১১ বছর কাটিয়ে সেখানে জেতেন একবার ফার্স্ট ডিভিশন ট্রফি আর দুইবার এফএ কাপ। তার মাঠে থাকা মানে ছিল দলের মানসিক শক্তি বেড়ে যাওয়া। দর্শকরা তার বিশাল শরীরের জন্য মজা করে স্লোগান দিত, “Who ate all the pies?” তার উত্তর ছিল এক হাস্যরসাত্মক কথাবার্তা, “তারা যা বলুক, শুধু আমার দুপুরের খাবারের সময় যেন না আসে দেরি।”

তবে খেলোয়াড় ও দর্শকদের মাঝে তার জনপ্রিয়তা শুধু হাসি-ঠাট্টায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তার রাগ বেশ ভয়ানক ছিল—যখন রেগে যেতেন, একবার কোনো দর্শককে মাফ না চাওয়া পর্যন্ত তার ওপর বসে থাকার মত অবস্থা ছিল। তার খাওয়ার ব্যাপারে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না, এমনকি হোটেলের খাবার মাঝে মাঝে পুরো দলেই না খেয়ে তিনি একাই শেষ করে দিতেন।

শেফিল্ডের সাথে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ছিল ১৯০২ সালের এফএ কাপ ফাইনাল। সাউদাম্পটনের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল নিয়ে বিতর্ক, যেখানে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় হঠাৎ করে অফসাইড পজিশনে গোল করেন। রেফারির সিদ্ধান্ত ছিল গোল বৈধ, কিন্তু ফৌলকের প্রতিবাদ ছিল অনড়। ম্যাচ শেষে তিনি রেফারিদের ড্রেসিংরুম পর্যন্ত গিয়ে তাদের সর্তক করেন, এমনকি দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন। ফৌলকের এই অগ্নিমূর্তি দেখে রেফারি আশ্রয় নেন ঝাড়ু রাখার আলমারিতে। সে সময়ের ফুটবল অঙ্গনে এমন সাহসী ঘটনা বিরল।

চেলসিতে যোগদানের পর তার পরিচিতি আরও বেড়ে যায়। চেলসি মালিক তাকে দর্শক টানাতে ব্যবহার করতেন, এমনকি গোলপোস্টের পাশে ছোট দুই ছেলেকে দাঁড় করিয়ে তার দেহের বিশালতা বাড়িয়ে দেখানো হত। বল মাঠের বাইরে গেলে ছেলেরা তা এনে দিতেন—এভাবেই ফুটবলে বলবয়ের প্রচলন শুরু হয়। তার খেলার কিছু মজার কাহিনী এত বিখ্যাত যে, একবার তিনি ক্রসবার ধরে ঝুলে থাকায় সেটি ভেঙে পড়েছিল, আর কখনো বিপক্ষের খেলোয়াড়কে নেটে ছুঁড়ে মারার মত রাগ দেখিয়েছেন।

ব্র্যাডফোর্ডে অবসরের আগে তার শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হয়ে আসে। পায়ের ইনজুরি ও অতিরিক্ত ওজন মিলিয়ে খেলোয়াড় জীবনের শেষ পর্ব কষ্টকর ছিল। অবসরের পরও তিনি ‘বিট দ্য গোলি’ চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিতেন এবং শেফিল্ডে নিজের দোকান চালাতেন। তার এফএ কাপের মেডেল গলায় ঝুলিয়ে রাখার গল্প আজও ফুটবল ইতিহাসে প্রণিধানযোগ্য।

ফৌলকে শুধু ফুটবলারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দুই ধরনের ক্রীড়াবিদ—ফুটবল ছাড়াও ক্রিকেটেও তার অবদান ছিল। ১৯০০ সালের শীতকালে ডার্বিশায়ারের হয়ে চারটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছিলেন, যেখানে তার ব্যাটিং গড় ছিল সম্মানজনক ১০.৮৩। যদিও পরবর্তীতে ক্রিকেট ছেড়ে দেন, তবে এটিই তাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ফৌলকের ফুটবল জীবনের ওপর আজকের ভিডিও ক্লিপ বা সরাসরি কোনো ফুটেজ পাওয়া যায় না, কিন্তু তার কিংবদন্তি আজও ফুটবল বিশ্বের গলায় বাজছে। মাঠে তার দক্ষতা, খেলা ও ব্যক্তিত্ব একে ইতিহাসের রঙিনতম চরিত্রের মধ্যে স্থান দিয়েছে।

উইলিয়াম হেনরি ‘ফ্যাটি’ ফৌলকে ছিলেন শুধু একজন গোলরক্ষক না, তিনি ছিলেন এক সময়ের ফুটবল অঙ্গনের জীবন্ত প্রতীক, যিনি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছিলেন—তার দৈহিক গঠন ও প্রবল মনোবল ফুটবল ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।