
প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ছিল কৃষি সমৃদ্ধ অঞ্চল। পদ্মা, যমুনায় ও মেঘনা বিধৌত বাংলার মাটি ছিল ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে উর্বর। আর ঠিক এ কারণেই এ দেশের মাটিতে সোনা ফলতো। কিন্তু জালের ন্যায় সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা নদীমাতৃক এই দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক। নৌপথকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা যোগাযোগ ব্যবস্থা শুকনো মৌসুমে অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ত। তাছাড়া দেশীয় মাঝি-মাল্লাদের ব্যবহৃত নৌকা ছিল আকারে খুবই ছোট এবং ধীর গতিসম্পন্ন। অত্রাঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য ও মালামাল পরিবহনের জন্য এই নৌকাগুলো অযোগ্য ছিল।
ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘রোভার স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি’ বৃহৎ পরিসরে এদেশে স্টিমার সার্ভিস চালু করে। বৃহৎ আকৃতির এই স্টিমারগুলো মালামাল এবং যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বেশ আধুনিকতা এনে দেয়। তাছাড়া দেশীয় নৌকা এবং স্টিমারের তুলনায় এগুলোর গতিও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু তারপরও বৃহৎ কৃষি পণ্য পরিবহনের জন্য নৌপথকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা যথার্থ ছিল না। প্রয়োজন দেখা দিল আরো বৃহৎ এবং দ্রুতগামী যোগাযোগ ব্যবস্থার।
ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পণ্য আমদানি-রপ্তানি সবক্ষেত্রেই কলকাতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ অঞ্চলের মানুষকে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতে হতো কলকাতায়। উৎপাদিত পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে হতো কলকাতার বন্দর দিয়ে। শুধু তাই নয়, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কলকাতায় হুগলী নদীর পাড় ধরে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এ ধরনের কোনো শিল্প কারখানা সেসময় পূর্ব বাংলায় ছিল না। এ দেশের পাটশিল্প, মৎস্য শিল্প, এবং চা সবচেয়ে বেশি পরিমাণে কলকাতা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করা হতো। আর এই কৃষিপণ্যগুলোই এ দেশে রেলপথ স্থাপনে পথ প্রসারিত করেছিল।
সে সময়ের ফরিদপুর
ফরিদপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা। ১৭৮৬ সালে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই জেলার নাম তখন ফরিদপুর ছিল না। জালালপুর নামক এই জেলাটির প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকাতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটিই সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র জেলা, যার প্রধান কার্যালয় জেলা শহরে না হয় ঢাকায় অবস্থিত ছিল। ১৮০৭ সালে জেলাটির কার্যালয় ঢাকা থেকে সরিয়ে ফরিদপুর শহরে স্থানান্তর করা হয়। আর সে সময় জালালপুর নামটি পরিবর্তন করে জেলাটির নামকরণ করা হয় ফরিদপুর। প্রখ্যাত সাধক এবং দরবেশ খাজা মাইনউদ্দিন চিশতী (রহ:) এর শিষ্য শাহ ফরিদ (রহ:) এর নামানুসারে এ জেলার নামকরণ করা হয়। সে সময় ফরিদপুর, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর এই ৫টি জেলা নিয়ে ফরিদপুর জেলা গঠিত ছিল।
প্রাচীনকালে ‘ফতেহাবাদ’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে পাট এবং নীল চাষ হতো। এ জেলার মাদারীপুর থেকে হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ফরায়েজী আন্দোলন। ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ অঞ্চলে দলে দলে নীলকররা আসতে থাকে। প্রতিষ্ঠা করতে থাকে অসংখ্য নীলকুঠি নামক টর্চার সেল। বাধ্য করে এ অঞ্চলের মানুষকে নীল চাষ করতে। কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করতে এ জেলায় ৫২টি নীল কুঠি স্থাপন করা হয়েছিল এবং এর প্রধান ম্যানেজার ছিলেন ডানলফ। অন্যান্য জেলার ন্যায় এ জেলায়ও নীল বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। হাজী শরীয়তুল্লাহর ছেলে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে নীল বিদ্রোহ ইতিহাসের পাতায় আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
একসময় এ জেলা বিলপ্রধান জলাভূমি এলাকা ছিল এবং পদ্মার প্লাবনে পলি মাটিতে উর্বর হতো। এ কারণে এ অঞ্চল কৃষি সমৃদ্ধ ছিল। এছাড়া বিল অঞ্চল হওয়াও প্রচুর পরিমাণে মাছ উৎপাদিত হতো। অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী ছিল এ অঞ্চলের মানুষ। পৌরসভা শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রিটিশদের কাছে ফরিদপুরের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
রাজবাড়ী-ফরিদপুর-ভাঙ্গা রেল সেকশন
১৮৭১ সালে কুষ্টিয়ার জগতি থেকে পাচুরিয়া হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি। কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতামুখী যাত্রীদের পদচারণায় গোয়ালন্দ ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী বন্দরে পরিণত হয়। জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই রেল সেকশনটি। জগতি-গোয়ালন্দ সেকশনের পাচুরিয়া থেকে মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে বাংলার অন্যতম প্রাচীন জেলা শহর ফরিদপুরের অবস্থান।
কুমার নদীর তীরে ফরিদপুর জেলা শহর ১৮৬৯ সালে পৌরসভা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ফলে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের কাছে এর গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। তাই ১৮৭১ সালে যখন পাচুরিয়া হয়ে গোয়ালন্দ ঘাটে রেলপথ নির্মিত হলো তখন ব্রিটিশরা ফরিদপুরে রেলপথ নিয়ে যাওয়ার মতলব আটতে থাকে।
সেই মোতাবেক ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি ফরিদপুরে রেলপথ নির্মাণের জন্য বাংলা সরকারের কাছে চিঠি চালাচালি শুরু করে দেয়। অনুমতি মেলার পরে নেমে যায় ভূমি জরিপ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাছে। জরিপ কার্যক্রম শেষে সম্ভব্য নির্মাণ খরচ জানিয়ে দেওয়া হয় সরকারকে। এ অঞ্চলে রেলপথ নির্মাণ লাভজনক হবে এমন প্রত্যাশা থেকে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
১৮৯৫ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে বিল ও জলাভূমিতে শুরু করে দেয় এক মহা কর্মযজ্ঞ। কর্দমাক্ত জলাভূমি হওয়ায় এ অঞ্চলে রেলপথ নির্মাণ করতে কোম্পানিটিকে বেশ বেগ পেতে হয়। প্রচুর পরিমাণে মাটি নিয়ে আসতে হয় বাইরে থেকে। তারপরেও দেশীয় শ্রমিকদের সহায়তা কয়েকটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মাণ কাজ চলতে থাকে। অবশেষে ১৮৯৯ সালে রাজবাড়ীর পাচুরিয়া থেকে ফরিদপুর হয়ে পুকুরিয়া পর্যন্ত ৫২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মিত হয়। সে বছরই ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রেলপথটি খুলে দেয়া হয়।
দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে ফরিদপুরবাসীকে রেল সুবিধা দেওয়ার পর এই সেকশনটি মুখে থুবড়ে পড়ে। ১৯৯৮ সালের ১৫ই মার্চ অব্যবস্থাপনা ও লোকসানের কারণ দেখিয়ে সরকারি এক গেজেটের মাধ্যমে রেলপথটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর কারণ ছিল, প্রথমত রেলপথটি দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয়ত, ব্যাপকহারে টিকিটবিহীন যাত্রী ভ্রমণের কারণে রেলের অর্থব্যবস্থায় ধস নেমেছিল।
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার কারণে সেকশনটি ট্রেন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে রেলপথটি পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন কর্যক্রম শুরু করা হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর পরে ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে রেলপথটি উদ্বোধন করা হয়। ২০১৯ সালে ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর নির্মাণাধীন রেলরুটের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জে রেল এলো
সে সময় মধুমতি বিধৌত গোপালগঞ্জ ছিল জলা এবং ডোবা অঞ্চল। অর্থনৈতিকভাবে যেমন ছিল অনুন্নত, তেমনি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাত্রার মানও ভালো ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্যের সংস্থান যেমন ছিল না, তেমনি বছরের অধিকাংশ সময় জমিতে পানি জমে থাকায় তেমন ফসলও উৎপাদিত হতো না। বছরের এক মৌসুমে ধান এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে উৎপাদিত হতো পাট। এছাড়া কিছু পরিমাণে আখ, তরমুজ, বাদাম, কাউন ইত্যাদির চাষ হতো। তবে এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে মাছ উৎপাদিত হতো। ফরিদপুর জেলা হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার পর গোপালগঞ্জ ছিল সেই জেলার একটি মহকুমা।
গোপালগঞ্জে রেলপথ নির্মাণের জন্য এ অঞ্চলে উৎপাদিত পাটের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া যেহেতু গোপালগঞ্জের নিকটবর্তী অঞ্চলে রেলপথ নির্মিত হয়ে গেছে, কাজেই খুব কম খরচে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা যাবে। এমন চিন্তা থেকেই ব্রিটিশ সরকার গোপালগঞ্জে রেল নিয়ে আসার জন্য পরিকল্পনা করতে লাগল। কলকাতাগামী মূল সেকশন ব্রডগেজ রেলপথ হওয়ায় গোপালগঞ্জেও ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৯২৮ সালে শুরু হয়ে যায় জরিপ কার্যক্রম। এরপর রেলপথ নির্মাণের কাজে হাত দেয় ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি।
জগতি-গোয়ালন্দ ঘাট রেল সেকশনের কালুখালী জংশন থেকে মধুখালী, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী হয়ে ভাটিয়াপাড়া ঘাট পর্যন্ত রেলপথ নির্মিত হয় ১৯৩২ সালে। ব্রডগেজ এই রেলপথটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। মধুখালী জংশন থেকে একটা শাখা লাইন নিয়ে যাওয়া হয় কুমারখালী ঘাট পর্যন্ত। কয়েক দশক দোর্দণ্ডপ্রতাপে ট্রেন চলাচলের পর ১৯৯৭ সালের ১৯শে আগস্ট অলাভজক ও ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথের অজুহাতে কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া রেলপথ পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ফরিদপুরের ন্যায় এই অঞ্চলেও টিকিটবিহীন যাত্রী ভ্রামণের কারণে রেলওয়ে যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তেমনি সংস্কারের অভাবে রেলপথও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
২০১১ সালে ৩২১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৫ কিলোমিটার রেলপথটি সংস্কার ও পুনর্বাসন কর্যক্রম শুরু হয়। ২০১৩ সালের ২ নভেম্বর ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে রেলপথটি পুনারায় উদ্বোধন করা হয়।
এদিকে ২১১০.৫৬ কোটি ব্যয়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে কাশিয়ানী থেকে দিঘলিয়া, গোপালগঞ্জ হয়ে গোবরা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৮ এর সেপ্টেম্বরে। সেবছরই ১লা নভেম্বর টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস চলাচলের মাধ্যমে রেলপথটি উন্মুক্ত করা হয়।
রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হলে ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জ থেকে নিয়মিত গোয়ালন্দ ঘাট পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করত। গোয়ালন্দ থেকে ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেসে করে সরাসরি চলে যাওয়া যেত কলকাতায়। সে সময় প্রচুর পরিমাণে কাঁচা পাট ফরিদপুর থেকে ট্রেনে করে কলকাতা নিয়ে যাওয়া হতো। আর এই পাট দ্বারা হুগলি তীরবর্তী পাটকলগুলোতে তৈরি বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হতো বিদেশে। সরাসরি শুকনো পাটও কলকাতা বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হতো।
রেলপথ নির্মাণের ফলে অত্রাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার চিত্র পাল্টে যায়। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে সর্বক্ষেত্রেই। মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। প্রায় ১২০ বছর পূর্বে, যে সময় মানুষ বঞ্চিত ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে, সেই সময়ে ট্রেনের মতো দ্রুতগামী বিস্ময়কর বাহন দেখে বিস্মিত হয়েছিল অনেকেই। শতাব্দী প্রাচীন ধোঁয়া উগড়ানো কয়লার ট্রেন আজ শুধুই স্মৃতি।
মূল প্রতিবেদনটি এখানে পেতে পারেন।


