দর্শক যখন থিয়েটারের অন্ধকার হলরুমে বসে পর্দা উঠার অপেক্ষায় থাকেন, তখন খুব কমেই বোঝা যায়, মঞ্চের ওপাশে একজন শিল্পী কী বিপুল প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হচ্ছেন। তার কণ্ঠ, শরীর, অভিব্যক্তি, নীরবতা- সবই তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের ভাষা। আর এই ভাষার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে পরিচিত করে তুলছেন একজন শিল্পী- নাজিয়া আন্দালিব প্রিমা।
তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী নন, তিনি পারফর্মিং আর্টের একজন নিরীক্ষাধর্মী অন্বেষক, যিনি মঞ্চ, শরীর, শব্দ এবং দর্শকের মনকে মিলিয়ে তৈরি করেন একটি আলাদা বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় পৌঁছে যাচ্ছে প্যারিস, বার্লিন, নিউ ইয়র্ক, সিওল কিংবা সিডনির মতো শহরেও।
শুরুটা বাংলাদেশেই
নাজিয়ার শৈশব কেটেছে ঢাকার সাংস্কৃতিক আবহে। ছোটবেলা থেকেই থিয়েটার তাকে টানত, মঞ্চের আলো তাকে মোহিত করত। তিনি পড়াশোনা করেছেন পারফর্মিং আর্টস এবং থিয়েটারে, পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিদেশে। দেশে-বিদেশে নানা থিয়েটার স্কুলে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন একজন শক্তিশালী পারফর্মার হিসেবে।
কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি শুধুই অভিনয়ে। পারফর্মিং আর্টকে তিনি দেখেন সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ও অস্তিত্বচিন্তার সঙ্গে মেলানো এক মাধ্যম হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে আলাদা করেছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ
নাজিয়া আন্দালিব প্রিমার কাজের বিশেষত্ব হলো — তিনি শুধুমাত্র নিজের মঞ্চ বা নিজের বক্তব্যেই থেমে থাকেন না। বরং তার শিল্পচর্চা এক ধরনের কালচারাল ডায়ালগ। তিনি বাংলাদেশি পরিচয়কে তুলে ধরেন এমনভাবে, যা স্থানিক সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, তার প্রযোজনা “গানবাজি”, যেখানে তিনি বাংলাদেশের লোকসংগীত, আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস এবং নারীর ভূমিকা একসঙ্গে মিশিয়েছেন। এই পারফরম্যান্সটি আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যালে প্রশংসিত হয়েছে।
তিনি যখন বিদেশে মঞ্চে উঠেন, তখন তিনি শুধুমাত্র একজন অভিনেত্রী নন — বরং বাংলাদেশের প্রতিনিধি। তিনি তার শিল্পের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেন বাঙালি পরিচয়, গ্রামীণ জীবন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শহর ও গ্রামের টানাপোড়েন, নারীর ভেতরের জটিলতা। তার কাজে থাকে বাংলা কবিতা, লোকগান, শরীরী অভিব্যক্তি আর শব্দের অপূর্ব মেলবন্ধন।
সমাজ ও রাজনীতির প্রতিচ্ছবি
নাজিয়া প্রিমা বিশ্বাস করেন, থিয়েটার কেবল বিনোদন নয়, বরং এটি প্রতিরোধের ভাষা। তার অনেক কাজেই উঠে আসে নারীর স্বাধীনতা, সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, পরিবেশ সংকট, এবং অধিকার নিয়ে প্রশ্ন।
তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যেখানে ‘নীরবতা’ই হয়ে উঠেছে ভাষা। কোনো সংলাপ ছাড়াই, শুধুমাত্র শরীর ও মঞ্চসজ্জার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করেছেন নারীর নিপীড়নের ইতিহাস। আবার কোথাও তিনি ব্যবহার করেছেন লোককথা ও ঐতিহ্যকে, যা একদিকে আমাদের শিকড়ের কথা বলে, অন্যদিকে সমকালীন বিশ্ববাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত করে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা ও তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা
নাজিয়া প্রিমা শুধু নিজেই পারফর্ম করছেন না, তরুণদের জন্য কর্মশালা, ওয়ার্কশপের আয়োজন করে যাচ্ছেন। তিনি চান নতুন প্রজন্ম থিয়েটারকে কেবল পেশা নয়, জীবনের পথ হিসেবে দেখুক।
তার লক্ষ্য, পারফর্মিং আর্টসের মাধ্যমে এমন এক সংলাপ তৈরি করা — যা জাতি, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তাবাদের সীমা অতিক্রম করে এক সার্বজনীন মানবতার পথে পৌঁছে দেয়। সেই পথেই তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছেন বিশ্ব মঞ্চে।
শেষ কথা
নাজিয়া আন্দালিব প্রিমার নামটি হয়তো এখনো বাংলাদেশের গণমাধ্যমে অতটা আলোচিত নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, থিয়েটার ও পারফর্মিং আর্টসের জগতে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের এক শক্তিমান দূত। তার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় — শিল্প কেবল রূপ বা বিনোদন নয়, এটি হতে পারে পরিচয়, প্রতিবাদ, পরিবর্তন আর সম্মানের শক্তি। সেই শক্তির মঞ্চে দাঁড়িয়ে নাজিয়া প্রিমা বিশ্বের সামনে তুলে ধরছেন এক নতুন, গভীর ও গৌরবময় বাংলাদেশ।


