কান বন্ধ বন্ধ বা ভারী হয়ে যাওয়া, চুলকানি, ভেজা ভজা অনুভব করা, হালকা ব্যথা ও কান থেকে পাতলা পানির মত কিছু বের হতে প্রায়ই শোনা যায়। এ সমস্যাটি বর্ষাকালে বেশি হয়ে থাকে, খুবই অস্বস্তিকর এক অনুভূতি। ছোট বাচ্চাদের কানে মাঝে মাঝে ব্যথা করতে পারে। কটন বাড দিয়ে কান পরিষ্কার করলে কালো কালো ময়লা বা ভেজা খবরের কাগজ অথবা দুধের সর এর মতো কিছু বের হতে দেখা যায়।
কানে এসমস্ত সমস্যাগুলোর জন্য দায়ী ছত্রাকের সংক্রমণ। একে অটোমাইকোসিস বলে।
আর্দ্রতা, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব সাধারণত ছত্রাক সংক্রমণের জন্য দায়ী। সাথে ডায়াবেটিস ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি থাকলে ছত্রাক সংক্রমণ সহজতর হয়।
বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক দিয়ে সংক্রমণ হতে পারে। এদের মধ্যে কোনোটি দেখতে কালো, কোনোটি বাদামি, সাদা আবার কোনোটি ভেজা কাগজের মতো আঁঠালো।
যে সমস্ত ছত্রাক দায়ী:
♣ এ্যাস্পারজিলাস- ৬৫%।
♣ ক্যান্ডিডা- ২৪%।
♣ পেনিসিলিয়াম- ১০%।
♣ অন্যান্য- যেমন: মিউকর, আলটিমারিয়া, জিওট্রাইকাম ও ক্লাডোস্পোরিয়াম- ১%।
রোগের লক্ষণ সমূহ:
★ কানে অস্বস্তিকর অনুভূতি হওয়া,
★ কানে ব্যথা,
★ কান থেকে পাতলা পানির মত কিছু বের হওয়া,
★ কানে চুলকানি,
★ কান বন্ধ হয়ে যাওয়া,
★ কানে সামান্য কম শুনতে পাওয়া,
★ কান ভেজা ভেজা লাগে। কান থেকে মাঝেমধ্যে তরল পদার্থের নিঃসরণ হওয়া। তবে এর পরিমাণ সাধারণত বেশি হয় না।

কান পরীক্ষা করে যা পাওয়া যায়:
কানের বাহিরের অংশ সাধারণত স্বাভাবিকই থাকে। খুব বেশি সংক্রমণ হলে কানের চামড়া আক্রান্ত হতে পারে।
কানের ছিদ্র থেকে পর্দা পর্যন্ত প্রায় ইঞ্চি খানেক লম্বা যে পথ সেখানে ছত্রাকের দলা পাওয়া যেতে পারে।
যদি ছত্রাকের সঙ্গে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ হয় তাহলে সেখানে তরল পদার্থ নিঃসরণ হয়। এমনকি দুর্গন্ধ হতে পারে। ছত্রাকের দলা কালো, বাদামি, সাদা, দুধের সরের মতো অথবা ভেজা কাগজের মতো দেখতে হবে।
কানের পর্দা স্বাভাবিক থাকবে। তবে কখনো কখনো সংক্রমণের তীব্রতার ওপরে নির্ভর করে লাল হতেও পারে।
পরীক্ষা নিরীক্ষা:
সাধারণত কান দেখেই এই রোগ নির্ণয় কারা হয়, তবে সময় ও সুযোগ থাকলে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
যেসব রোগীর বারবার কানে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়, তাদের রক্তে সুগার মাপতে হবে, কারণ ডায়াবেটিস রোগীদের কানে ছত্রাকের সংক্রমণের প্রবণতা একটু বেশি।

চিকিৎসা:
একজন নাক কান গলা রোগের চিকিৎসক ভালো করে রোগের বিবরণ শুনে, কান পরীক্ষা করে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ধীরে ধীরে কান থেকে ছত্রাকের দলা বের করবেন। কানটা শুকনো করবেন।
তারপর ছত্রাকরোধী মলম বা ড্রপ দেবেন। বাজারে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন রকমের ওষুধ পাওয়া যায়। পুরো মাত্রায় পুরো মেয়াদে যথাযথভাবে ওষুধ ব্যবহার করলে পুরোপুরি রোগমুক্ত হওয়া যায়। কান সেরে যাবে।
এর পাশাপাশি ডায়াবেটিক থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা করতে হবে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ওষুধ ব্যবহার শেষে পুনরায় কান পরীক্ষা করাতে হবে। এর পাশাপাশি কানে ব্যথা হলে ব্যথানাশক ওষুধ খেতে হবে। যদি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয়, তাহলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।
কানে চুলকানি কমানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের এন্টিহিস্টামিন থেকে সঠিক ওষুধটি বেছে নিতে হবে।
প্রতি ক্ষেত্রেই একজন যোগ্যতাসম্পন্ন নাক কান গলা রোগের চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা গ্রহণ এবং ফলোআপ করতে হবে। অন্যথায় হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কানে ছত্রাকের সংক্রমণ হতে প্রতিরোধের উপায়:
★ দেশলাইয়ের কাঠি, কটন বাড, মুরগির পাখা, ঝাড়ুর শলা, কাপড়, কলমের ক্যাপ প্রভৃতি দিয়ে কান খোঁচানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
★ রাস্তাঘাটে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কান পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকা।
★ নোংরা ময়লা পানিতে গোসল না করা।
★ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।
ডা. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (ইএনটি)
নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ও হেড-নেক সার্জন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।


