মহান আল্লাহর আসমাউল হুসনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম শাকুর। এর অর্থ মহান আল্লাহ তাঁর দাসদের ভালো কাজের প্রতি ব্যাপক কৃতজ্ঞ এবং তিনি কৃতজ্ঞতার অত্যন্ত সমাদরকারী ও কৃতজ্ঞদের বিপুল পুরস্কার দিয়ে থাকেন। পবিত্র কুরআনে চার বার মহান আল্লাহর এই নাম এসেছে।
আশ্-শাকুর মানে গুণগ্রাহী, সুবিবেচক। এ নামের দলিল হলো আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী (সুরা আত-তাগাবুন/ আয়াত ১৭):
إِنْ تُقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا يُضَاعِفْهُ لَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ شَكُورٌ حَلِي
আরবি উচ্চারণ: ইন্ তুকরিদু ল্লা-হা র্ক্বাদ্বোয়ান্ হাসানাইঁ ইয়ুদ্বোয়া-ই’ফ্হু লাকুম্ অ ইয়ার্গ্ফি লাকুম্; অল্লা-হু শাকূরুন্ হালীম্।
বাংলা অনুবাদ: যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান কর [১], তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। [২] আর আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল।[৩]
অর্থাৎ, [১] খালেস নিয়তে (আন্তরিকতার সাথে) এবং সন্তুষ্ট মনে যদি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর। (তাহলে তা তোমাদের বৃথা যাবে না। বরং তা ঋণের মত পরিশোধ করা হবে।) [২] তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে পরিশোধ করার সাথে সাথে তিনি তোমাদের গোনাহসমূহকেও মার্জনা করে দেবেন। [৩] তিনি গুণগ্রাহী: তিনি তাঁর অনুগতদেরকে বহুগুণ সওয়াব দানে ধন্য করেন। তিনি সহনশীল: তিনি অবাধ্যদেরকে সত্বর পাকড়াও করেন না। (সূত্র: তাফসীরে আহসানুল বায়ান ও বাংলা হাদিস)
মহান আল্লাহ এমন এক শাকুর বা কৃতজ্ঞ যার চেয়ে বড় কৃতজ্ঞ আর কেউ নেই এবং তাঁর এই কৃতজ্ঞতা অব্যাহত থাকে। মহান আল্লাহ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন যথাযথভাবে ও যার যতটুকু প্রাপ্য তার চেয়েও বহু গুণ বেশি পুরস্কার দিয়ে। মহান আল্লাহ এমন এক শাকুর বা কৃতজ্ঞ যিনি প্রতিটি সৎকর্মের জন্য পুরস্কার দিয়ে থাকেন যদিও মহান আল্লাহ তাঁর দাস বা সৃষ্টিকুলের কাউকে কোনো ভালো কাজের পুরস্কার দিতে মোটেও বাধ্য নন এবং তা না করলেও আল্লাহর কাছে পুরস্কার দাবি করার কোনো আইনি বা আইনগত অধিকার কারোরই নেই। কারণ কেউ ভালো কাজ করলে তা নিজের কল্যাণের জন্যই করে বা পারলৌকিক পুরস্কারের আশায় করে কিংবা নীতি-নৈতিকতা আর বিবেকের টানেই তা করে থাকে।
তাই কারো ভালো কাজ আল্লাহকে যেমন কোনো কল্যাণ দান করে না এবং কেউ মন্দ কোনো কাজ করলেও আল্লাহর তাতে কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও মহান আল্লাহ অত্যন্ত করুণাময় বলেই প্রতিটি ভালো কাজের পুরস্কার দিয়ে থাকেন। যেমন, কেউ সত্যের পথে অগ্রসর হলে, নিজেকে সংশোধন করলে ও পাপ বর্জন করলে মহান আল্লাহ তাকে অনেক অনুগ্রহ করেন এবং এ ধরনের কাজকে আল্লাহর প্রতি ভালো কিছু করা হিসেবে ধরে নিয়ে পুরস্কার দেয়ার মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জানান।
মহান আল্লাহ সুরা ইনসান-এর ২২ নম্বর আয়াতে সৎকর্মশীলদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন:
এইসব বড় নেয়ামত ও নজিরবিহীন অনুগ্রহ তোমাদের সৎকর্মের পুরস্কার এবং তোমরা আল্লাহর নির্দেশাবলী মেনে চলার জন্য যেসব প্রচেষ্টা চালিয়েছে তা কবুল করা হয়েছে ও তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
মহান আল্লাহ এখানে যেসব নেয়ামতের সুসংবাদ দিয়েছেন তা সর্বোত্তম ও তুলনাবিহীন। মহান আল্লাহ মানুষের কাজকর্ম ও মনোভাব সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন। আর তাদের ভালো কাজের প্রতি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা তথা পুরস্কার দুনিয়াতে যতটা না স্পষ্ট হবে তার চেয়েও বেশি পরলোকে স্পষ্ট হবে। পার্থিব জীবনে যে সামান্য ইবাদত মানুষ করেছে দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে তার পুরস্কার হিসেবে পরলোকে পাবে বেহেশতের অশেষ অনুগ্রহ ও নেয়ামত। আসলে পার্থিব সসীম জীবনে সেইসব অশেষ নেয়ামত ও কল্যাণ ধারণ করার ক্ষমতাও মানুষের নেই।
সুরা হাক্কার ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
বিগত দিনে তোমরা যা করেছিলে, তার প্রতিদানে তোমরা খাও এবং পান কর তৃপ্তি সহকারে।
এটা স্পষ্ট যে আল্লাহর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা ও বান্দাহ’র পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে সীমাহীন পার্থক্য। মানুষের কৃতজ্ঞতা হল আল্লাহর দয়াকে বুঝতে পারা ও সেজন্য সাধ্যমত কৃতজ্ঞতা জানানো। আর তা করা হয় মৌখিকভাবে, হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে ও কাজের মাধ্যমে। কখনও আল্লাহকে স্মরণ করে ও অশেষ নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বান্দাহ এবং এটা অনুভব বা স্মরণ করা হয় যে আমাদের যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাটা জরুরি।
আর যেহেতু নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে তাই যথাসময়ে সেসবের যথাযথ ব্যবহারই ন্যায়নীতির দাবি সেসবের অপব্যবহার নয়। খোদায়ি নেয়ামত যথাযোগ্যভাবে ব্যবহার করা হলে দুনিয়ায় ও পরলোকে তার ফল স্পষ্ট হবে।
আর কখনওবা বান্দাহ হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে মহান আল্লাহর নেয়ামত ও দয়ার কথা স্মরণ করে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায় অসীম দয়ালু আল্লাহকে। এরফলে মহান আল্লাহর প্রতি তার মন বিনম্র থাকে ও ভীত-বিহ্বল হয় তার গোটা দেহ আর মন।
আর কাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বলতে বোঝায় আল্লাহর নেয়ামতকে তাঁর প্রতি আনুগত্যের ও ইবাদাতের মাধ্যম করা। অন্য কথায় এইসব নেয়ামত যে জন্য দেয়া হয়েছে সে কাজেই সেসবকে ব্যবহার করা হচ্ছে কাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। অবশ্য মহান আল্লাহ মানুষের কৃতজ্ঞতার মুখাপেক্ষী নন, বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও মনোনিবেশ মানুষেরই সম্মান ও পূর্ণতার কারণ হয় এবং তা মানুষের কল্যাণ বাড়িয়ে দেয়।
সুরা লোকমানের ১২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো কেবল নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে এনে ও অজস্র নেয়ামত দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন- এ বাস্তবতার উপলব্ধি বা অনুভূতির কারণে মানুষ তার সমগ্র সত্ত্বা দিয়ে মহান আল্লাহর প্রশংসায় মশগুল হয়। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাধ্য নেই মানুষকে কিছু দেয়ার। অন্যদের কাছে চাইলেও অন্যরা যদি সামান্য কিছু দিয়েও থাকে তাও আল্লাহরই সম্পদ এবং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বাধা না থাকার কারণেই তা দিতে সক্ষম হয় তারা।
মহান আল্লাহ কোনো কাজের পুরস্কারই নষ্ট করেন না- এই উপলব্ধিও মানুষকে কৃতজ্ঞতাবোধের আনন্দে আত্মহারা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। কৃতজ্ঞচিত্তের মানুষ কেবল যে আল্লাহর নেয়ামতের জন্যই যে কৃতজ্ঞ তা নয়, এমন মানুষ অন্যদের দয়া ও মেহেরবানীর প্রতিও কৃতজ্ঞ থাকে। কারণ অন্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আল্লাহর প্রতিই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নামান্তর।
ইমাম সাজ্জাদ (আ) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে: ‘মহান আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন বান্দাহকে বলবেন: যারা তোমার উপকার করেছিল তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়েছিলে কি? উত্তরে বান্দাহ বলবে: আমি তো তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি। মহান আল্লাহ তখন বলবেন, তুমি উপকারকারী মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওনি বলে আমার প্রতিও কৃতজ্ঞ হওনি। আল্লাহর প্রতি তারাই সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতাশীল যারা মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।’
সুরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর।
আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাস বা ঈমান মহান আল্লাহর এক মহাঅনুগ্রহ। কারণ এরই সুবাদে বিশ্বাসী মানুষের জন্য দোযখ হারাম হয় ও মানুষ হয় অল্পে তুষ্ট এবং অন্যদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়ানো থেকে তাকে বিরত রেখে এভাবে আল্লাহ তার সম্মানও রক্ষা করেন। কৃতজ্ঞ ও ঈমানদার মানুষ কখনও তার সম্পদের বাহ্যিক স্বল্পতার জন্য আল্লাহর প্রতি নাখোশ থাকে না।
মহান আল্লাহর শাকুর নামের রঙে রঙিন হতে হলে মানুষের হওয়া উচিত হযরত মুসার মত কৃতজ্ঞ। মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি হযরত মুসাকে (আ) যথাযথভাবে কৃতজ্ঞ হতে বললে তিনি বলেন, আমি কিভাবে তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করব যখন প্রতিটি কৃতজ্ঞতাও তোমারই পক্ষ থেকে দেয়া নেয়ামত? মহান আল্লাহ তখন বললেন: এ বিষয়টি স্বীকার করে তুমি আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে সক্ষম হলে।
নবী-রাসুল ও ইমামরা মহান আল্লাহর নেয়ামতের তুলনায় তাঁদের অত্যধিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশকেও খুবই কম ও তুচ্ছ এবং একেবারেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করতেন। তাদের মতে আল্লাহর নেয়ামত যেমন গুণে শেষ করা ও সেসবের সংখ্যা সম্পর্কে এমনকি কল্পনা করাও যেমন অসম্ভব তেমনি যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও অসম্ভব যদিও অনন্তকাল ধরেও আমরা কৃতজ্ঞতা জানাতেই থাকি মহান আল্লাহর প্রতি।
যুগ যুগান্তর ধরে কৃতজ্ঞতা জানিয়েও মহান আল্লাহর কেবল একটি অনুগ্রহের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করা সম্ভব নয় বলে মনে করতেন তাঁরা। ইমাম সাজ্জাদও (আ) এমনই মনোভাব নিয়েই বলেছেন, হে আল্লাহ! কিভাবে আমি তোমার সব নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করব যখন প্রতিটি অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সৌভাগ্য অর্জনের জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা জরুরি! তাই আমি আপনার যত প্রশংসাই করি না কেন সেসব প্রতিটি প্রশংসার জন্যও আবারও তোমার প্রশংসা করছি।


